বিজয় মজুমদার
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর মাউথপিস হিসেবে পরিচিত মাইওয়াড্ডি টেলিভিশন ১ ফেব্রুয়ারিতে ঘোষণা করে যে মিয়ানমারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি উ মাইন্ত সোয়ে দেশটিতে এক বছরের এক জরুরী অবস্থা জারী করেছেন। তিনি মিয়ানমারের সংবিধানের ৪১৭ ধারা অনুসারে এই আদেশ জারী করেন। মিয়ানমারে ২০০৮ সালে যে সংবিধান সংশোধনী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সে নির্বাচনের পরে দেশটির সংবিধানে ৪১৭ ধারা যোগ করা হয়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর দল স্টেট পিস অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট কাউন্সিল বা টাটামাডাও দেশটির নির্বাচনে ৯৩.৮২ শতাংশ ভোট পায়। সাইক্লোন নার্গিসের আঘাত হানার পর অনুষ্ঠিত হওয়া এই নির্বাচন সারা বিশ্বের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। তবে এই নির্বাচন টাটমাডাওকে সংবিধান সংস্কার করার ক্ষমতা প্রদান করে। এই সংশোধনী সংবিধানে এক বিশেষ ধারা যুক্ত করা হয়। যে ধারায় উল্লেখ করা হয় যদি মিয়ানমারের কোনো নাগরিক বিদেশি কাউকে বিয়ে করেন তবে তিনি মিয়ানমারের রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের অযোগ্য প্রমাণিত হবেন। এই আইনটি করার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির নেত্রী অং সান সূচি যেন ক্ষমতায় আসতে না পারেন। তবে এই সংবিধান দেশটিতে বহুদলীয় নির্বাচনের পথ খুলে দিয়েছিল।
সংশোধিত সংবিধানের ৪১৭ ধারায় উল্লেখ করা আছে যদি রাষ্ট্রের অখণ্ডতা, জাতীয় ঐক্য বিপন্ন হয়, যদি দেশটির স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়ে এবং দেশজুড়ে সহিংস অবস্থার সৃষ্টি হয়, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি দেশ রক্ষায় জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কাউন্সিলের পরামর্শে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন। তবে এই জরুরি অবস্থা জারির পর সেটি পরিস্থিতি বিবেচনায় এক বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে এবং সংবিধানের ৪১৮ ধারা অনুসারে রাষ্ট্রপতি এই জরুরি অবস্থায় তার সকল ক্ষমতা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধানের হাতে অর্পণ করবেন।
২০০৮ সালের এই সংবিধানে দেশটির সংসদে ২৫ শতাংশ আসন সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়। যদিও বিরোধী দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি এই সংবিধান সংশোধনের বিরুদ্ধে না ভোট দেওয়ার জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছিল, তবে নিয়ম রক্ষার এই নির্বাচন মূলত সামরিক বাহিনীর ভয়কে দূর করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। দেশটির সামরিক বাহিনীর ভয় ছিল সুষ্ঠু নির্বাচন সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতা বিলোপ করবে।
২০০৮ সালের সংবিধান সংশোধন-এর পর মিয়ানমারে ২০১০ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অং সান সূচির নেতৃত্বে দেশটির গণতান্ত্রিক দল এনএলডি সে নির্বাচন বয়কট করে। সে নির্বাচন ছিল সামরিক বাহিনীর গণতন্ত্রের ঘাড়ে আসীন হওয়ার প্রথম ধাপ। কারণ সামরিক বাহিনীর জেনারেলেরা জানতেন কোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচনে তারা জয়লাভ করতে পারবেন না।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হতে পারবেন না জেনেও ২০১৫ সালে মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচনে সূচির দল ক্ষমতায় আসে। মূলত তিনি সামরিক বাহিনী প্রণীত সংবিধান এবং তাঁদের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগির বাস্তবতায় ক্ষমতায় আসেন, যা সামরিক বাহিনীকে আবার ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্র তৈরি করে। সে নির্বাচনে এনএলডি সংসদের ২৩৪ টি আসনের মধ্যে ১৩৪ টি আসনে বিজয় অর্জন করে। যদিও সূচি নিজে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে পারেন
নি, তবে এনএলডির ক্ষমতা অর্জনের ফলে দলটির সিনিয়র এক নেতা উয়িন মিন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, কিন্তু দেশ ও দল পরিচালনার মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল স্টেট কাউন্সিলার নামে নতুন পদে নিযুক্ত হওয়া সূচির হাতে।
অভ্যুত্থানের ঘটনা প্রবাহ
২০২০ সালের নভেম্বর মাসে মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে হাউজ অফ ন্যাশনালিটিজে এনএলডি ১৩৮টি আসন পায়। আর ইউএসডিপি নামের সামরিক বাহিনীর সাথে যুক্ত রাজনৈতিক দল পায় ৭টি আসন। দেশটির হাউজ অফ রিপ্রেজেনটেটিভে এনএলডি ২৫৮ টি আসন এবং ইউএসডিপি পায় ২৬টি আসন।
নির্বাচন-এর ফল প্রকাশের পরে সামরিক বাহিনী সমর্থিত ইউএসডিপি এবং ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ ন্যাশনাল পলিটিক্স দাবি করে যে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়
নি
এবং নির্বাচনে জেতার জন্য এনএলডি ব্যাপক ভোট কারচুপির আশ্রয় নিয়েছে। সামরিক বাহিনীও একই অভিযোগ উত্থাপন করে। দল দুটি কেবল অভিযোগ করে ক্ষান্ত দেয়
নি, তারা এই নির্বাচনে প্রতারণার অভিযোগ এনে রাষ্ট্রপতি উয়িন মিন্ত, স্টেট কাউন্সিলার সূচি ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার উ হ্লা থিয়েন সহ ১৪ জন নির্বাচন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে এক মামলা দায়ের করে।
মামলার শুনানি চলাকালে দেশটিতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে মিয়ানমারে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান আসন্ন। বিশেষ করে যখন সামরিক বাহিনী দেশটির নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করে। বিভিন্ন গুজবের মাঝে সেনাবাহিনী প্রচার মাধ্যমের সামনে কোনো ধরনের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার বিষয়টি অস্বীকার করে। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল জাও মিন সংবাদ মাধ্যমে কথা বলার সময় কোনো ধরনের সামরিক অভ্যুত্থানের ধারণা দৃঢ় ভাবে নস্যাৎ করে দেন। কিন্তু এই ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যে সামরিক বাহিনী দেশটির নিয়ন্ত্রণ ভার গ্রহণ করে। ক্ষমতা দখলের আগে তারা দেশটির স্টেট কাউন্সিলার অং সান সূচি, রাষ্ট্রপতি উয়িন মিন্ত সহ এনএলডি এর সিনিয়র নেতাদের আটক করে। যদিও সূচি তাঁর ফেসবুক পাতার মাধ্যমে দেশটির জনগণকে এই অভ্যুত্থানের রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত দেশটি সেনা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বেসামারিক ও সামরিক সংঘাত কি অনিবার্য ছিল
এনএলডি ক্ষমতায় আসার আগে থেকে দলটির সাথে দেশটির সামরিক বাহিনীর মধ্যে টানা পোড়নের এক সম্পর্ক বিরাজ করছিল। দেশটির দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসান ঘটে মূলত এনএলডির বিজয়ের মাধ্যমে। সামরিক বাহিনী ধারণা করেছিল এই বাহিনী সমর্থিত দলগুলো নির্বাচনে বেশ ভাল ফলাফল করবে। কিন্তু বাস্তবে ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা দেয়। ২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচন সামরিক বাহিনী সমর্থিত দুটি দলই নিদারুণ পরাজয়ের সম্মুখীন হয়। এতে বেসমারিক সরকারের সামনে সুযোগ তৈরি হয় সংবিধান সংশোধনের। যদি সে সম্ভাবনা তৈরি হতো তাহলে দেশটির রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাব অনেক খানি ক্ষুণ্ণ হত।
সংসদে ২৫ শতাংশ আসন সামরিক বাহিনীর হাতে রয়েছে। সামরিক বাহিনীর প্রধান এই সকল সংসদের নিয়োগ প্রদান বা নির্বাচিত করে থাকেন। এই ২৫ শতাংশ সংসদ কার্যত ২০০৮-এর সংবিধানের কোনো ধরনের সংশোধনের বিরুদ্ধে। এদের কারণে কোনো বেসামরিক সরকারের পক্ষে সংবিধান সংশোধন করা কার্যত অসম্ভব। এছাড়া দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সীমান্ত সেনাপ্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিয়োগও সেনাপ্রধানের হাতে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির শুধু প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করে না, একই সাথে দেশটির অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান মিয়ানমার ইকোনোমিক কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রক যা দেশটির সকল ব্যবসা বাণিজ্য ও শিল্প কারখানা পরিচালনা করে থাকে।
এই রকম একটি বাস্তবতায় একটি রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশের বেসামরিক ও সামরিক সরকারের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য। কারণ রাষ্ট্রের যে কোনো ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সামরিক বাহিনীর প্রতি দারুণ ভাবে নির্ভরশীল হতে হয়, যে সামরিক বাহিনী কোনো বেসামরিক সরকার দ্বারা বলা যায় খুব সামান্য সময়ে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। এই অবস্থায় সামরিক বাহিনীর বিপক্ষে যায় এমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ বেসামরিক শাসকের পক্ষে অসম্ভব। মিয়ানমারে শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণকারীর ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর প্রবল বিরোধিতার মুখোমুখি হওয়া অনিবার্য।
অং সান সূচি জনপ্রিয়তা হারিয়ে ক্ষমতা হারালেন
নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে কিনা সেটির বিচার বিভাগীয় তদন্তের আগেই সূচি ক্ষমতা হারালেন। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর আগে তিনি দেশে ও বিদেশে উভয় ক্ষেত্রে তার জনপ্রিয়তার অনেক খানি খুইয়েছেন। সূচি, যিনি সারা বিশ্বে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক প্রতীক ছিলেন, তিনি ক্ষমতায় এসে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কাছে মাথা নুইয়ে প্রথমে বিদেশে জনপ্রিয়তা হারান। মিয়ানমারের আরকান অঞ্চলে জাতিগত রোহিঙ্গা নিধনে দেশটির ভূমিকায় তিনি নিজে জড়িয়ে পড়েন এবং এই কর্মকাণ্ডকে ধামাচাপা দেওয়ার প্রচেষ্টা সারা বিশ্বে ব্যাপক নিন্দা কুড়ান।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিয়ানমারের ভদ্র চেহারার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হওয়া সূচি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীদের জীবন রক্ষায় কঠোর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে অসমর্থ হন। একই সাথে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানান। এমন কী তিনি বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা শব্দটিও উচ্চারণ করেননি। যে পশ্চিমা বিশ্বে তাকে মানবিক ও গণতান্ত্রিক নেত্রী হিসেবে সারা বিশ্বে তুলে ধরেছে সেখানে তিনি এমন ভাষায় কথা বলেছেন, তাতে মনে হয়েছে রোহিঙ্গা জাতিগত নিধন অনেক বেশি অনিবার্য বাস্তবতা ছিল।
তিনি ভেবেছিলেন এতে স্বদেশে তাঁর মুখ ও ক্ষমতা দুটোই রক্ষা হবে, কিন্তু বাস্তবে তা হয়
নি।
পশ্চিমা মিডিয়ার এই প্রিয়মুখ মিয়ানমারের মুখ রক্ষা করতে ব্যর্থ হন। সারা বিশ্বে মিয়ানমার প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে। এই অবস্থায় সূচি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এই সমস্যার সমাধানের যে কয়টি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন সেটি নিজ দেশে ততটা জনপ্রিয় হয়
নি।
মিয়ানমারের সামরিক শাসকেরা পশ্চিমের প্রতি ততোটা নমনীয় ও অনুরক্ত নন যতটা অং সান সূচি। দেশটির সেনা ও উগ্র জাতীয়তাবাদীরা তাঁর কাছে সামরিক সূর আশা করেছিল, কূটনৈতিক সূর নয়।
রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান কার্যত আরো জটিল হল
বাংলাদেশ সরকার আশা করছে যে মিয়ানমারের সরকার পরিবর্তনের ফলে এই আলোচনায় কোনো সমস্যার সৃষ্টি হবে না। বাস্তবে এটি এখন আরো জটিল ও কঠিন এক সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো। ক্ষমতা দখলের এই বিষয়টিকে জনগণের কাছে জনপ্রিয় ও বৈধ করার এক কৌশল হিসেবে সামরিক সেনারা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পারেন। এতে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান তো হবেই না, বরঞ্চ নতুন করে শরণার্থীদের ঢল নামতে পারে। অন্যদিকে যদিও সামরিক শাসকেরা মিয়ানমারের প্রতিশ্রুতি অনুসারে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গা স্বদেশে যেতে বিন্দুমাত্র আগ্রহী হবে না, কারণ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গরম তাওয়া থেকে তাদের এখন জ্বলন্ত চুল্লিতে প্রবেশ করতে হবে।
লেখক, বিজ্ঞাপনকর্মী ও সমাজকর্মী
ড. বিজন কুমার শীল বিস্তারিত
বিপরীত স্রোত প্রতিবেদন বিস্তারিত
ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরী বিস্তারিত
যারিন মালিয়াত অদ্রিতা বিস্তারিত
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান বিস্তারিত
মুস্তাকিম আহমেদ বিস্তারিত
সাংবাদিক শফিক রেহমানের পুরো বক.. বিস্তারিত
উৎপাদিত মাছের প্রায় ১২ শতাংশ আ.. বিস্তারিত
বাতিলযোগ্য সাইবার নিরাপত্তা আই.. বিস্তারিত