রাগিব উদ্দিন আহ্ম্মদ
আমাদের জীবনের জটিলতা নিজস্ব মানসিক বিবেচনায় হীনমন্যতা কিংবা উচ্চাভিলাষের ফলাফল, এসব মানসিক রোগ। ঠিক যেন একই মুদ্রার দু’রকমের দুই পিঠ। আমরা সকল মানুষই, কম বেশি এ রোগের শিকার। এ রোগের গোড়া বা কারণ হলো নিজের সাথে অপরের তুলনা। আর এ তুলনা থেকেই উৎপত্তি হয় প্রতিযোগিতা, সংগ্রাম আরো অনেক কিছু শেষ হয় যুদ্ধে। এ কর্মকা-ের কেউ সমাপ্তি করেন হেরে গিয়ে অথবা নিজকে পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেন আপোস করে বা হতাশায় ভোগেন, এমনকি আত্মহননের পথও বেছে নেন। জীবনের যে কোনো পথেই হোক না কেন তা মোটেও ফুল বিছানো নয় বরং দুর্গম আর দুর্ভোগের। জীবনটা ছোট বা বড় ঢেউয়ের মতো, তা যাই হোক আমরা সবাই সমুদ্র মন্থনেই ব্যস্ত, এই ডুবছি আবার ভেসে উঠছি। আমরা পুকুরে, নদীতে বা সাগরে যেখানেই সাঁতরাই না কেন আমরা সবাই একই সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত। হীনমন্যতা অথবা উচ্চাভিলাষ উভয়ই মানবিক বিকাশের অন্তরায়। এ অনুভূতি ছোট অথবা বড় কিন্তু সম্পূর্ণ নয়। এটা এক জটিল ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি যা আমাদের সমস্যাকে সমাধান করতে দেয় না। এ জটিলতাই মানবÑব্যক্তি বিকাশের অন্তরায়। কখন শুরু করতে হবে এ জটিলতা থেকে নিজেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা? আমি বলবো জন্মের আগে থেকেই। না, অবাক হবার কিছু নেই, জন্মের আগে থেকে শিশুর জন্মদাতা পিতামাতার কর্তব্যের অবহেলা শিশুর গোটা জীবনের বোঝা হতে পারে। মায়ের পুষ্টিকর খাবার, দুশ্চিন্তামুক্ত গর্ভকাল, ডেলিভারির সঠিক ব্যবস্থা সময়ের চাহিদা মাফিক থাকলেই একটি স্বাভাবিক সুস্থ শিশুর জন্ম হয়। একটি মানব সন্তান জন্মাতে শিশুর সাথে মায়ের জীবনও চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা, ঐতিহ্য, ধর্মীয় অনুশাসন নারী-পুরুষ ভেদে বৈষম্য তৈরি করে পরিবার, সমাজ এবং কর্মক্ষেত্রে। পারিবারিক নানান আচার-ব্যবহার শিশু জন্মের আগে থেকে শুরু করে তার প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত তার স্রষ্টা প্রদত্ত সৃজনশীলতা বিকাশে ব্যত্যয় ঘটায়। বিশ্বায়নের এ সময়ে আমাদের দেশের সামাজিক বৈষম্য রাজনৈতিক ইমেজের খাতিরে বা চালে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঠিক চিত্র মিডিয়াতে আসে না বা বিকৃত ভাবেই উপস্থাপিত হয়। অতিমাত্রার ও দ্রুত নগরায়নের ফলে শহরের প্রায় এক তৃত্বীয়াংশ জনগোষ্ঠী বস্তিতে (প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো) বসবাস করছে। নগরবস্তি অস্বাস্থ্যকর, মাদক, অপরাধ ও মানবেতর জীবন রােষ্ট্রর বড় বোঝা, যা সদা বাড়ন্ত জনসংখ্যার সাথে একই অনুপাতে বাড়ছে (বেশিও হতে পারে)। বস্তির সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা গোটা শহর তথা দেশের ওপর প্রভাব ফেলছে। বস্তিতে নারী ও শিশুরা সবচাইতে বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা বিচারহীনতাকে প্রতিষ্ঠিত করছে। এদের হয়ে বা এদের পক্ষে যারা (এনজিও) কথা বলবে বা তাদের স্বার্থ দেখভাল করবে সেখানেও পচন ধরেছে, তারা (তথাকথিত সুশীল সমাজ) সমাজের সবচাইতে বড় জ্ঞানপাপীর রূপ ধারণ করেছে। বস্তিবাসী হলো এনজিওদের পুঁজি, এদেরকে দেখিয়ে (ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে) তারা সরকার বা দাতা সংস্থার ফান্ড পায়।
আমরা একটা মানব শিশু জন্মানোর আগেই সমস্যার জন্ম দিই, তাই যেন স্বাভাবিক। অবুঝ শিশু জানে না সে মাতৃজঠরে থাকা অবস্থায় মায়ের কী কষ্ট হয়। তাকে জন্ম দিতে তার ও মায়ের জীবন বিপণœ, মৃত্য ঝুঁকিতে থাকে। আমাদের দেশে একজন মেয়ে, মা হবার আগে সে সর্ম্পকে জ্ঞান লাভ করতে পারে না। তাই কবি বলেন ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’। আসল জায়গাটা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে এ শিক্ষা নাই, সেক্স এডুকেশন এদেশে পাপের বিষয়। প্রজনন শিক্ষাকেও সেক্স এডুকেশন মনে করা হয় এবং তা নিষিদ্ধ করতে সমাজপতি ও ধর্মের ধ্বজাধারীরা তৎপর হয়ে উঠেন। শিশু জন্মানোর পর আমরা টেনশনে থাকি, প্রথম কান্নার জন্য, শিশু তার প্রথম চিৎকারে আগমনের বার্তা শোনায়, দুনিয়ায় প্রথম বাতাসে শ^াস নেয়। তারপর আমরা ব্যস্ত হয়ে দেখার চেষ্টা করি শিশুটি স্বাভাবিক হয়েছে তো? কিন্তু তার জন্মের আগে স্বাভাবিক হবার জন্য কী কী করণীয়, তা জন্মদাতা মাতাপিতা কতোখানি সচেতন? জানা মতে এ বিষয়ে সবচেয়ে সচেতন ইহুদিরা, তার ফলাফল: পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ০.১৯% হলেও পৃথিবী ২০% এর বেশি নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী ইহুদিরা। তারা জাতিগত ভাবে সুসন্তান (মেধাবী) তৈরিতে সচেতন। আমাদের অবস্থান ঠিক তার বিপরীত। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পৃথিবীর সবচাইতে জটিল, সেখানে একজন শিক্ষার্থীকে ক্লাস ফোর বা ফাইভে থাকতে, অর্থাৎ বায়োঃসন্ধির বয়সের ঠিক আগেও সেক্স এডুকেশন/ প্রজনন শিক্ষা দেয়া হয় না। যার ফলে ছেলেরা তাদের চেয়ে বড় বয়সের বন্ধু বা ভাইদের কাছে সে সর্ম্পকে যা জানে, এবং পরিচিত সবচাইতে দুষ্টু বা বখে যাওয়ার কাছেই গোপন কথা শেখে যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুল ও বিভ্রান্তিকর হয়ে থাকে। মেয়েরা তাদের শারীরিক পরিবর্তনের সময় ভয় পায় এবং প্রথম প্রিয়ড বা মাসিক হবার ঘটনাকে দুর্ঘটনা, এক খারাপ অভিজ্ঞতা বলেÑ যা বেশ লম্বা সময় নিয়ে মা, খালারা ধারণা দেন। যা উচিত ছিল আগেই জানা। আট বছর বয়েসের শিশুদের এবং বয়োসন্ধিকালীন সময়ে সঠিক ও বিস্তারিত শিক্ষা প্রয়োজন যৌনস্বাস্থ্য/ প্রজনন বিষয়ে যা তাদের সঠিকভাবে পূর্ণবয়স্ক হতে সহায়তা করবে। ভুল শিক্ষা তাদের বিপথগামী করে সারা জীবনের জন্য স্বাস্থ্যহানি ও সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করবে। মেয়েদের কুমারীমাতা ও যৌনরোগাক্রান্ত করে। এমনকি এইচআইভির মতন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এ শিক্ষা শিশুদের, বয়োঃসন্ধিকালীন ছেলেমেয়েদের এমন কি অভিবাবকদেরও প্রয়োজন। এ শিক্ষা সুষ্ঠু সমাজ গঠনের প্রস্তুতি, যার অভাবে আজ ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, বিকৃত মানসিকতার কাজ, বিবাহ বিচ্ছদ, খুনের মতন অপরাধ বেড়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারই বুঝে কীভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে শান্তি। এমনকি অভিযোগ আছে, দেশের মাদ্রাসায়ও সমকামী শিক্ষক আছেন, যারা মাদ্রাসার বাচ্চাদের ভয় কিংবা বাড়তি সুবিধা ও ভালো ফলাফলের প্রলোভনে যৌনাচারে লিপÍ করেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে সমকামিতা ইসলাম ধর্মে সবচেয়ে গর্হিত কাজ যার ফলাফল মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে আ’দ এবং সামুদ জাতির ধ্বংসের কথা বর্ননা করেছেন ( সুরা: শু’আরা ২৬: ১২৮, ১২৯, ১৬৫ এবং ১৬৬)।
আমাদের এ ভূখন্ডের জন্ম সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে থেকে শুরু হয়েছে। সাড়ে চারশত কোটি আগে জন্ম নেয়া পৃথিবীর বয়স অনুপাতে খুবই কম। বর্তমান ভারত ছিল মহাসাগরের এক বিশাল দ্বীপ, সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে এক ভূতাত্ত্বিক মহাপরিবর্তনে পৃথিবীর সর্বউচ্চ ও সর্বকনিষ্ঠ পাহাড় হিমালয়ের জন্ম। তারপর থেকেই হিমালয়ে দক্ষিণের সাগর থেকে জলীয় বাষ্প ও মেঘের প্রচুর বৃষ্টিপাত উত্তরের হিমালয়ে বাধা পেয়ে পানির তোড়ে নেমে আসা পলি, মাটি, কাঁকড় আর পাথরে সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশ নামের ভূখ-, এক পললভূমি যে ভূমি গঠন প্রক্রিয়া আজো চলছে। আমরা এ দেশে ধর্ম, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিকে মিশিয়ে জীবনযাপন করি।
ভারত বর্ষে প্রথম ধর্মের আবির্ভাব ঘটে সুদূর মেসোপোটেমিয়া থেকে আর্য ধর্ম, যা বেদ রচনার অনেক আগেকার কথা। সিন্ধু নদীর অববাহিকয়র মহেঞ্জদারো, হরপ্পা (বর্তমানে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের এক ধ্বংসপ্রাপ্ত ঐতিহাসিক নগরী, এই দুই নগরীর দূরত্ব সাড়ে ছয় শত কিলোমিটার, ছয় দিনের পায়ে হাঁটা পথ। সাথে গরুর গাড়িতে সময়কে অর্ধেকে আনা সম্ভব হতো) তার এক হাজার কিলোমিটার দক্ষিণের ডোলাভিরা (যা বর্তমানে ভারতের গুজরাট এর আরেক ঐতিহাসিক ধ্বংসপ্রাপ্ত নির্দশন) যা পায়ে হেঁটে আসতে দশ দিনের পথ ছিল। এরা ছিল দ্রাবিড়। এদের পর ভারতবর্ষ ক্রমান্ময়ে রাজা মহারাজাদের শাসিত দেশে রূপান্তরিত হতে থাকে। আর্য ধর্মে সকল মানুষের সমঅধিকার নিশ্চিত ছিল। ছোট ছোট রাজ্যেও রাজাগণ প্রজাদের কাছ থেকে ফসলের কর/ খাজনা আদায় করতেন। তার একটা অংশ দিয়ে রাজ্য চালাতেন বাকিটা মহারাজাদের দিতে হতো। রাজা মহারাজাগণ প্রজাদের মাঝে বিভক্তি আনার জন্য প-িতগণকে জাতপাত ভেদাভেদ সৃষ্টির লক্ষ্যে বেদ রচনার আদেশ দেন। সনাতন ধর্ম নামে চলছিল আর্য ধর্ম, সহজ পালন যোগ্য অষ্ট আর্য মার্গ। তার বিপরীতে বেদ নিয়ে আসলো জাতিভেদ ব্রাহ্মণ (রাজা,পূজারী, শিক্ষক), ক্ষত্রিয় (শাসক, যোদ্ধা, পরিচালক), বৈশ্য (উৎপাদনকারী, কর্মী) ও শুদ্র (নিচু কাজের লোক, পয়ঃপরিষ্কারকারী)। প্রথমে তৈরি হলো ১০,৮০০ শ্লোকের ঋগ্বেদ। যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদ চর্তুবেদী এ ধর্মই এখন হিন্দু ধর্ম নামে পরিচিত।
ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি চলে সামাজিক শিক্ষা, জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশ, ভারত বর্ষ হয়ে ওঠে গণিতশাস্ত্র ভিত্তিক বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। গণিতে শূন্যের ব্যবহার একে দ্রুতগামী করে তোলে। শিক্ষার জন্য উপাসনালয় থেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাঠশালা গড়ে উঠে, যার ক্রমান্বয়ে বিকশিত হয়ে দেশে এখন বহুব্যবস্থার এক খিচুড়ি মার্কা শিক্ষা ব্যবস্থা বিরাজমান। তবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সর্বকালের পারিবারিক শিক্ষা যা বর্তমানে এক অবক্ষয়ের শিকার। আগের যৌথপরিবার এখন আর নেই, বর্তমানে একই পরিবারে এখন দুই জেনারেশনের পার্থক্য বিশাল ব্যবধান এবং অশান্তির মূল কারণ।
পারিবারিক সঠিক শিক্ষার অভাবের মূল কারণ বর্তমানের কালোটাকার বা অসৎ আয়ের ফসল। পরিবারের প্রধান বা উপার্জনকারী নিজে অসৎ পথে আয় করেন বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক সমাজ ব্যবস্থায়। শিক্ষাও এ অসুস্থ প্রতিযোগিতার চরম শিকার। অসুস্থ রাজনীতি, চরম দুর্নীতিপরায়ণ শাসন ব্যবস্থা, শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার বাণিজ্যিকরণ, অপরিকল্পিত নগরায়ন, পরিবারিক বন্ধনহীনতা আর মাদকের নিয়ন্ত্রণহীন এক ক্ষয়িষ্ণু সমাজে বসবাসকারী নাগরিক (দেশবাসী) চরম হতাশায়, বিবাহ বিচ্ছেদ (বিয়ের পরে নতুন আমদানি, পাশ্চাত্যের ব্রেক আপ সংস্কৃতি), আত্মহত্যা, খুন, নারী ও শিশু নির্যাতন, বিকৃত লালসার শিকারের চিত্র আজ পত্রপত্রিকা বা মিডিয়ার প্রধান উপজীব্য বিষয়। এ রকম একটা আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় এর যে কোনো বিষয় নিয়ে ভাবনা, লেখালেখি বা কার্যকর কিছু করা আশু প্রয়োজন ও সময়ের দাবি।
মন্দ-আদর জীবন বিকাশের বড় অন্তরায় এর একটা অবহেলিত ও লুকায়িত বিষয় কিন্তু গুরুত্বহীন নয়। এর উচ্চারণ সবাই করছেন না। এখানে লজ্জা বা রাখঢাকের প্রশ্ন অবান্তর। বিষয়টির দীর্ঘ প্রেক্ষাপট তাই অবতারণ করতে হলো, তা না হলে এক নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে সমাজ এড়িয়ে যেতেই পারে। কিন্তু বর্তমান অবক্ষয়ের চরম সামাজিক সমস্যার গোড়ায় যাবার একটা পথ খুঁজে পাবার একটা ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা বলা যেতে পারে। যে কোনো সমস্যার মূলে যেতে না পারলে তার সমাধান আশা করা এক ব্যর্থতার অশনি সংকেত।
এমনকি আমাদের দেশের একজন উচ্চ শিক্ষিত মাও, মা হবার আগে চাইল্ড সাইকোলজি বা শিশু মনোবিজ্ঞানের একটা বই হাতিয়ে দেখেন না। বেশিরভাগ শিশুর জন্মই অপরিকল্পিত। বিয়ের পরপরই দেখা যায় নববিবাহিতা স্ত্রী গর্ভবতী হয়েছেন, তারপর কেউ নিয়মিত ডাক্তার দেখান কিন্তু বেশিরভাগই ঘরের টোটকায় নির্ভরশীল, শাশুড়িগণে কথা ‘আমরা কি আর বাচ্চা পয়দা করি নাই’। এ সকল কারণে আমাদের দেশে এখনো অপুষ্টির শিকারে কম ওজনের বাচ্চা, প্রতিবন্ধী শিশুর জন্মের হার সদা বাড়ন্ত। এর পরের স্তর আরো করুণ হাল আর তা হলো বাচ্চাকে সঠিক লালন-পালনে অভিজ্ঞতার অভাব। যেন বাচ্চাকে জন্ম দিয়েই সব দায়িত্ব শেষ, প্রকৃতপক্ষে এটা একটা জীবনের আজীবন দায়িত্ব। সেখানে পরিবারের ও প্রতিবেশীর সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ শিশুকে আগামীর নাগরিক মানব-সন্তান থেকে তাকে উপযুক্ত মানুষ গড়ে তোলার কাজটা অনেকের অবদানেই সৃষ্ট হতে হবে। যে কোনো বাচ্চা তা ছেলে বা মেয়ে হোক (তিন থেকে প্রাপ্ত বয়স্ক হবার আগ পর্যন্ত) তাদের শরীরের তিনটি বিপদজনক স্থান সম্পর্কে সচেতন করা আবশ্যক। এক. বুক, দুই. দুপায়ের মাঝে সামনের অংশ (যৌনাঙ্গ), তিন. দুপায়ের মাঝে পিছনের অংশ (পশ্চাৎদেশ)।
আমার মতে এগুলো প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। আমি প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণীর বাচ্চাদের গল্পের মাধ্যমে এ শিক্ষা দিচ্ছি। জরুরি ব্যাপার হলো উপস্থাপনা, শিশুদের উপযোগী করে বলা। ছবির মাধ্যমে বোঝালে বাচ্চারা সহজেই বোঝে। বাচ্চাদের এটা বোঝা জরুরি যে এ তিন বিপদজনক স্থানে একমাত্র মা ছাড়া আর কেউ র্স্পশ করতে পারবে না। যদি কেউ র্স্পশ করে তবে সজোরে চিৎকার করতে হবে আর সে স্থান দ্রুত ত্যাগ করে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে হবে। আর যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব এ কথা মাকে বা শিক্ষককে জানাতে হবে।
মন্দ-আদর কী? শিশুতোষ আদর কী? শিশুদের দেখলে সব মানুষের মাঝেই একটা ভালোবাসা সৃষ্টি হয় এটা মানব চরিত্রের সহজাত ব্যাপার। শিশুরা নিস্পাপ ও মাসুম তাই শিশু কার সে বিবেচনা মানুষ করে না, তাকে আদর করে। কোলে নেয়, চুমু দেয়, তার সাথে খেলা করে। আমাদের প্রিয় নবী করিম সা. শিশুদের এতোটাই ভালোবাসতেন যে কোনো শিশু এমনকি তিনি নামাজ আদায়রত অবস্থায়ও তাঁর পিঠে উঠলে তিনি সেজদায় থাকতেন যাতে করে শিশুটির খেলায় ব্যাঘাত না ঘটে। শিশুদের প্রতি আচরণে আমাদের জন্য অনেক হাদিস রেখে গেছেন।
মানুষ এক সামাজিক প্রাণী। আমাদের পরিবারের মানুষ, আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী সবাইকে নিয়েই এ সমাজ গঠিত। বর্তমানে ১১ থেকে ১৮ বছর বয়সী জনসংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ। এক সময় আমাদের দেশের বড় ঐতিহ্য ছিল একান্নবর্তী পরিবার, যেখানে কম করে চার জেনারেশন একসাথে বসবাস করতো। দাদার ভাইরা জমি ভাগ করতেন না। সেখানে পরিবারের নিকটজন আদরের নামে যৌন-হয়রানী করতো উঠতি বয়সী মেয়ে এমনকি ছেলেদের। মেয়েদের ব্যক্তিগত জায়গার অভাব, নিশ্চিন্তে গোসলের নিরাপদ জায়গার অভাব। এমনকি ঘরে যে নিরাপদে কাপড় বদল করবে তারও সঠিক ব্যবস্থা নাই। পরিবার থেকে এগুলো নিয়ে মুরুব্বিরা কোনো আলোচনা করেন না বা ব্যবস্থা নেন না। গ্রামে প্রায় প্রতিটি পরিবারে জায়গীর মাস্টার ব্যবস্থা ছিল, ক্ষেত্র বিশেষে এখনো আছে। শহরেও এ ব্যবস্থা বিরাজমান আছে। মাস্টারদের বেশ সম্মানীয় মনে করা হয়। আর সে সুযোগটাই মাস্টার সাহেব নেন। পড়ানোর ফাঁকে প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর এটা ওঠা উপহার বিনিময়, একটু স্লো-প্রসেসে গায়ে হাত, আদরের নামে সংবেদনশীল স্থানে র্স্পশ, প্রেমের নামে যৌন সর্ম্পক। ধরা না পড়লে সময় মতো মাস্টার সাহেব কেটে পড়েন, চরম পর্যায়ে মেয়ে অন্তসত্ত্বা হলে বিচার, বিয়ে অথবা সালিশেই সুরাহা করে বিষয় ধামাচাপার ব্যবস্থা আছে। প্রয়োজনে অ্যাবরশনেও সমাধান করে দেয়া হয়। কিন্তু মেয়েটির শারীরিক, মানসিক কী ক্ষতি হয় তা চিরকাল অন্ধকারে থাকে। এ ব্যাপারে আমার নিজস্ব অবজারবেশন ও গবেষণা আছে। এখানে একটি কেস স্টাডি তুলে ধরছি নাম পরিচয় না দিয়ে, সব সত্য ঘটনা।
কেস ১: বিউটিদের বাড়ি উপজেলা থেকে অনেক দূরের গ্রামে। বাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে প্রায় চার কিলোমিটার দূরের এক পাঁড়া গাঁয়ের স্কুলে পড়ে ক্লাস ফাইভে প্রথম হয়েছে। স্কুলের শিক্ষক (হেডমাস্টার) বিউটির বাবাকে বললেন, ‘মেয়ে আপনার একদিন বড় ডাক্তার হবে। কী করবেন ভালো ছাত্রী, শহরে পাঠিয়ে দিন।’ বিউটির বাবা পুলিশে চাকরি করেন, পোস্টিং পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম জায়গায়। নানান আলোচনার পরে বিউটির জীবন নির্ধারণ হলো উপজেলায় বাবার একজন পরিচিত কলেজ শিক্ষক আছেন, শিক্ষক মানেই তো ভালো মানুষ। সে বাড়িতে থেকেই বিউটির লেখাপড়ার ব্যবস্থা হবে। বাবার টাকার অভাব নাই, তাই একটা মাসোহারা নির্ধারণের মাধ্যমে প্রফেসর সাহেবের বাসায় বিউটির লেখাপড়ার ব্যবস্থা হয়ে গেল, উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে বড় ডাক্তার হবে। বাড়ি ও এলাকার মুখ উজ্জ্বল করবে। প্রফেসর সাহেবের বাসায় বিউটির খেলার সাথী হলো তার ছোট মেয়ে। প্রফেসর সাহেবের স্ত্রী প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। কাজেই প্রফেসর সাহেব নিজেই মেয়ে ও বিউটির দেখভাল করেন। বেশ আদর করেন বিউটিকে, মাঝে মধ্যেই এটাসেটা এনে দেন। আদর করে চুমো খান। একদিন গোসল করিয়ে দেয়ার ছলে বিউটিকে কাপড় খুলে তার দেহের সংবেদনশীল স্থানগুলো হাতিয়ে নেন। বিউটি নিষেধ করে, বাঁধা দেবার চেষ্টার করেছে কিন্তু তার সাথে পেরে উঠে না। খুব ঘৃণা লাগে তার। সারাটা গা ঘিনঘিন করে। নিজের প্রতি একটা বিচ্ছিরি ঘেন্না ধরে গেল বিউটির। কিন্তু প্রফেসর সাহেবের হুমকি কাউকে যেন এ সব কথা না বলে। এ সব বলতে হয় না। নানান ভাবে বুঝিয়েছেন প্রফেসর। এ ভাবে কেটে গেল বিউটির এসএসসি পর্যন্ত। প্রফেসরকে আর বেশি এগুতে দেয় নি বিউটি। কিন্তু তার এ বাজে অনুভূতির কারণে কলেজের হোস্টেলে উঠে বিউটি। উপজেলার ভালো কলেজে নিজের অবস্থান করে নেয় জিপিএ ৫ পেয়ে। সেই প্রফেসর সাহেব এখন এই কলেজের প্রিন্সিপাল। বিউটির সঙ্গে প্রতিদিনই তার দেখা হয়। বিউটির লেখাপড়ায় মন বসে না। এ অবস্থায় আমার সাথে পরিচয় ও কাউন্সেলিং এর জন্য আসে এক ম্যাডামের পরামর্শে।
তার একটাই কথা, ‘স্যার আমার সাথে কোনো শারীরিক সম্পর্ক গড়তে পারেন নাই কিন্তু সেই উঠতি বয়েসে আমার গায়ে হাতিয়ে যে বিচ্ছিরি অনুভূতির জন্ম দিয়েছেন তা আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না। নিজেকে খুব খারাপ মনে হয় আর গোটা পুরুষ জাতির প্রতি আমার একটা অভক্তি।’
আজ গ্রামে কিছু একান্নবর্তী পরিবার থাকলেও শহরে দুই জেনারেশন এক ছাদের নিচে বসবাস করতে অস্বস্থিবোধ করছেন। এ রকম অসংখ্য কেস নিয়ে বিচার বিবেচনা ও তার সম্ভাব্য সমাধানের পথ-নির্দেশনা দেবার সুযোগ আমার হয়েছে। তার দশভাগও যদি এ লেখায় সন্নিবেশ করি এর কলেবর আপনাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাবে। আরো একটা কারণে উদাহরণ দিতে দ্বিধা করছি যে তা লেখা অশোভন ও অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। আবার অনেকের ব্যক্তিগত জীবনের সাথে হুবহু মিলে গেলে আমি নানান আইনি জটিলতায় পড়ার সম্ভাবনাকে এড়িয়ে চলাই নিরাপদ মনে করছি।
মন্দ-আদর জীবন বিকাশের বড় অন্তরায় কেবলই নয় বর্তমান পারিবারিক অবস্থা, তথা সামাজিক দর্পনের পারদ হয়ে আছে। আজকে পত্রিকা খুললেই প্রথম যে খবরগুলো যে কোনো পাঠকের কাছে দৃশ্যমান হয় তা হলো ধর্ষণ। এ ধর্ষণের ব্যাপকতা বেড়েই চলেছে, আজ দু’বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে মসজিদের মতো পবিত্র স্থানে তাও রমজান মাসে, রোজারত থাকা এক ঈমামের দ্বারা। আবার পঞ্চাশঊর্ধ্ব ভদ্রমহিলাগণও ধর্ষণের করালগ্রাস মুক্ত নন। খুন-খারাপি, নারী ও শিশু নির্যাতন, শিশুদের পায়ুপথে হাওয়া ঢুকিয়ে হত্যা করে তার ভিডিওকে ইউটিউবে দিয়ে বাহবা নেয়া, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা মাদক, ধর্ষণের মতো নানান সামাজিক বিকৃত কাজে যখন লিপ্ত, সাধারণ মানুষ কি করে ঘুমাবে, জীবনযাপন করবে? আজ প্রশাসন, আইনের দরজা, পরিবারে একটি বাড়ন্ত বয়সের মেয়ে তার বাবার কাছেও নিরাপদ নয়। এমন অবস্থায় এক কিশোরী কার কাছে যাবে। কার কাছে বলবে যে তার গৃহশিক্ষক তাকে নানান কায়দায় যৌন-হয়রানি করছে। বাবাকে বললে তিনি দিচ্ছেন উল্টো ধমক, ‘এতো টাকা দিয়ে শিক্ষক রেখেছি তুমি তার নামে বদনাম করছো, আসলে তোমার লেখাপড়া করার ইচ্ছে নেই সেটা বলো।’ মা কে জানালে মা বলছেন. ‘তোর বাবাকে বলে তোর বিয়ে করিয়ে দেব।’ মেয়েটি যাবে কোথায়? ধর্ষণ একটা চরম সামাজিক ব্যাধি যা এখন মহামারীর আকার ধারণ করেছে। এ সামাজিক অবক্ষয়ের কথায় এখন পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়া প্রধান উপজীব্য, আমিও লিখছি! কিন্তু এর সমাধানের গোড়ায় যেতে হবে উৎপাটনের জন্য। আজকের পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয় নি যে তা একদিনে বা সহজেই সমাধান হয়ে যাবে। পরিবার থেকে মন্দ-আদর দিয়ে যে ক্ষতরোগের সৃষ্টি তার জন্য পরিবার থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। সে লক্ষ্যে পরিবারে অবাঞ্চিত ঘটনার প্রতি নজর দিতে হবে। পাঁচ বছর বয়স থেকেই ছেলে বা মেয়েদের প্রজনন ও প্রজনন শিক্ষা স্বাস্থ্যের অংশ হিসাবে শেখাতে হবে। মেয়েদের একা চলাচল এড়িয়ে যাবার লক্ষ্যে ভিন্নতর ব্যবস্থা করতে হবে। সম্ভব হলে উঠতি বয়সের (১২-১৯) আগেই তাদের আত্মরক্ষামূলক (আক্রমণাত্মক নয়) শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। সম্ভাব্য বিপদের কথা বিবেচনা করে চলাচল করতে হবে। ‘সাবধানের মার নেই’- এটা যেন নিছক বুলি না হয়। নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই শিখতে হবে কারণ দেশে বিরাজমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা-বাহিনী তাদের নিজেদের নিরাপত্তা দিতে অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে। পুলিশের আত্মহত্যার হার এখন যে কোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ অবস্থানে বিরাজমান, এটা দুঃখজনক। এমন কি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্য এখন মাদকসহ নানান অবৈধ কাজে লিপ্ত হচ্ছেন। পরিবার থেকে এ সকল শিক্ষা সমাজে, তথা দেশে ছড়িয়ে দিতে এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে সমাজের সবাইকে এক সাথে কাজ করতে হবে। সমাজের তথাকথিত সুশীল সমাজ এখন টকশোজীবী হয়ে জ্ঞানপাপীর ভূমিকায় অবতীর্ণ। সাংবাদিকগণ হলুদ-সাংবাদিকতা ও নানানভাবে অবৈধ টাকা কামানোর চেষ্টায় তাদের আর্দশচ্যুত হয়েই কাজ করছে। তাই এ লক্ষ্যে কাজ করার জন্যে আজ আর বিশেষভাবে অজ্ঞ-বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন বোধ করছি না কারণ, আমরা সবাই ভুক্তভোগী। আসুন যে যার অবস্থান থেকে এ জঘন্য সামাজিক অবস্থা থেকে নিজেকে, পরিবারের সবাইকে, তথা দেশ ও জাতিকে মুক্ত করি। সমাজ খুন, গুম, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, বিবাহ-বিচ্ছেদ ও বিচারহীনতা থেকে মুক্তি লাভ করুক।
বি. দ্র. আমার সব কথা আপনাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে এটা আমি আশা করি না। যা ভালো লাগবে না তা বাতিল করে বাকিটা উপভোগ করুন।
পরিবেশ বিজ্ঞানী, শিক্ষক, ফটোগ্রাফার, গভীর সাগরের ডুবুরি, ভাস্কর, চিত্রশিল্পী
ড. বিজন কুমার শীল বিস্তারিত
বিপরীত স্রোত প্রতিবেদন বিস্তারিত
ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরী বিস্তারিত
যারিন মালিয়াত অদ্রিতা বিস্তারিত
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান বিস্তারিত
মুস্তাকিম আহমেদ বিস্তারিত
সাংবাদিক শফিক রেহমানের পুরো বক.. বিস্তারিত
উৎপাদিত মাছের প্রায় ১২ শতাংশ আ.. বিস্তারিত
বাতিলযোগ্য সাইবার নিরাপত্তা আই.. বিস্তারিত