English
ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২০-১১-০৩ ১৩:০৩:৫২
আপডেটঃ ২০২৬-১০-০৪ ০৮:২২:৪৪


লেখালেখিতে কমপিউটারের চেয়ে কলম শক্তিশালী

লেখালেখিতে কমপিউটারের চেয়ে কলম শক্তিশালী

নাকিব এযাজ

 

লেখার ইতিহাসের শুরুতেই ছিল হাত দিয়ে লেখা। মানুষ তখন গাছের বাকল, পাতা, মাটি বা পাথরের উপরে হাতের সাহায্যে কোনো কিছু দিয়ে লিখত। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে লেখালেখির জন্য মানুষ এখন হাতের বদলে কিবোর্ড ব্যবহার করছে। কিবোর্ডের বোতামগুলোতে খটাস খটাস শব্দ তুলে চলে লেখালেখি। তবে সেটিকে আর লেখা বলা চলে না; সেটি হলো টাইপিং। কিবোর্ডে লেখালেখি করা যে খারাপ-এমন নয়। তবে হাতে লেখার মধ্যে একটা আন্তরিকতার বিষয় থাকে, মমতা থাকে। যেমন- আমাদের মনের ভেতরে নানা অনুভূতি চলতে পারে, আমরা তাড়াহুড়োয় থাকতে পারি, অনেক যত্ন ও ভালোবাসা নিয়ে কিছু লিখতে পারি। এমন খুঁটিনাটি বিষয় কখনও কিবোর্ডে টাইপ করে বোঝানো সম্ভব নয়। এ ছাড়া হাতের লেখায় একটা নিজস্ব দক্ষতার বিষয় জড়িত। আজকে যেসব কমপিউটার ফন্ট আমরা দেখি সেগুলো আসে কারও না কারও হাতের লেখা থেকে। তাই যতই প্রযুক্তি আসুক হাতের লেখার গুরুত্ব সহসা শেষ হবে না।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, তিনটি গবেষণার মিলিত ফলাফলে দেখা যায়, ল্যাপটপ ব্যবহারকারীর মস্তিষ্ক সামান্য বিশ্লেষণ বা সংশ্লেষণসহ একটি মোটামুটি নিখুঁত নোট নিতে পারে তবে অর্থপূর্ণ বোঝাপড়া বা অ্যাপ্লিকেশন প্রয়োগে ব্যর্থ হন। তাই, স্পষ্টতই সহজভাবে যেগুলো নোট টাইপ করা হতে পারে, তা করার ফলে বস্তুটি শিখতে ও মনে রাখা কঠিন হতে পারে!

 একই গবেষণাটি দেখানো হয়েছে যে, যারা তাদের নোটগুলো হাতে হাতে লেখা ছিল তাদের একটি শক্তিশালী ধারণা ছিল এবং তাদের ল্যাপটপগুলোর সাথে নোট নিয়ে ব্যবহৃত সামগ্রীগুলোর তুলনায় উপাদান প্রয়োগ এবং একত্রিত করার ক্ষেত্রে আরো সফল ছিল। লেখা নোটগুলো টাইপের চেয়ে ধীরগতির এবং আরো জটিল এবং শিক্ষার্থীরা সম্ভবত কোনো বক্তৃতাতে প্রতিটি শব্দ লিখতে পারে না। পরিবর্তে তারা শুনতে, হজম করে এবং সারসংক্ষেপ করে; যাতে তারা সংক্ষিপ্তভাবে তথ্য সারাংশ ক্যাপচার করতে পারে। এইভাবে, হাত দিয়ে নোটগুলো গ্রহণ করে মন্তিষ্কের কিছু ভারী ‘মানসিক বাড়তি’ অংশ নিতে বাধ্য করে এবং এই প্রচেষ্টাগুলো বোধগম্যতা ও ধারণ করে। ‘সামগ্রিকভাবে যারা তাদের নোটগুলো হাতে হাতে লিখেছিল তাদের একটি শক্তিশালী ধারণাগত বোঝাপড়া ছিল এবং এটি প্রয়োগে আরও সফল ছিল এবং তাদের ল্যাপটপের সঙ্গে নোট গ্রহণ করে যারা তুলনায় উপাদান একীভূত। এটি একটি নোট ব্যবহার করার সুবিধা তুলনায় এমনকি হাতে নোট নিতে একটি চমৎকার ভালো কারণ, একটি ল্যাপটপ ব্যবহার!

 

বৃটেনে ‘ডকমেইল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ২০১২ সালে এক জরিপ চালায় ২,০০০ লোকের ওপর। এতে উত্তরদাতাদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, তারা শেষ কবে হাতে কিছু লিখেছেন। তারা জবাব দেন, তারা হাতে কিছু লিখেছেন গড়ে ৪১ দিন আগে। তাদের দু-তৃতীয়াংশই বলেন, তারা যা লিখেছেন তা বাজারের ফর্দ বা এ জাতীয় সংক্ষিপ্ত নোট।

অনেকেই এ যুগে লেখেন কিবোর্ডে, মোবাইল ফোনে বা কমপিউটারে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, হাতে লেখার ক্ষমতা কি এখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে? বাচ্চাদের কি আর হাতে লেখা শেখানোর দরকার আছে? বাচ্চাদের কি এখন বরং টাইপ করা শেখানো উচিত? অনেকেই হয়তো এরকম একটা ব্যাপার অকল্পনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু সত্যি সত্যি কিছু দেশ এর মধ্যেই হাতে লেখা শেখানোটাকে তাদের স্কুলের কারিকুলাম থেকে বাদ দিয়ে, এটাকে ঐচ্ছিক বিষয়ে পরিণত করেছে। ফিনল্যান্ডে হাতের লেখা শেখানোর ক্লাস পর্যায়ক্রমে বাদ দেয়া হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় রাজ্য এক আইন পাশ করেছে। যাতে বলা হচ্ছে, স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের আর 'কার্সিভ' কায়দায় ইংরেজি লিখতে হবে না। ইংরেজি অক্ষরগুলো একটির সাথে আরেকটির রেখা সংযুক্ত করে লেখার রীতিকে বলা হয় 'কার্সিভ' লেখা। আমেরিকায় স্কুলগুলোতে আগে এই রীতিতে লেখার ওপর জোর দেয়া হতো- এখন তা বাদ দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, প্রতিটি অক্ষর আলাদা আলাদা করে লিখলে কোনো অসুবিধা নেই। তবে ইন্ডিয়ানার মতো কিছু স্টেটস ‘কার্সিভ’ লেখা স্কুলে শেখানো অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। এই বিষয়ে দক্ষতা ছাড়া তারা দাদা-দাদির দেয়া জন্মদিনের শুভেচ্ছা কার্ড, অ্যাসাইনমেন্টে শিক্ষকের করা মন্তব্য অথবা দেয়া হাতে লেখা যুক্তরাষ্ট্রের মূল সংবিধান এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পড়তে সক্ষম হবে না।

হাতে লেখা এবং টাইপিং এর মধ্যে কোনটি শিশুদের জন্য ভালো- এর ওপর এক জরিপ চালানো হয়েছিল ২০০৫ সালে। এতে দেখা গেছে যে, হাতে লেখা শেখার ফলে শিশুরা অপেক্ষাকৃত ভালোভাবে অক্ষর চিনতে পারে। গবেষকরা বলেন, এটা সম্ভব যে হাতে লেখা শিখলে তা বাচ্চাদের পড়া শেখায় সহায়ক হয়। যদিও এটা প্রমাণ হয়নি।

২০১৫ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যদি শিক্ষকদের কথা হাতে লিখে টুকে নেয়; তাহলে তারা তা কিবোর্ডে নোট নেয়া ছাত্রদের চেয়ে বেশি মনে রাখতে পারে। তবে কমপিউটারে নোট নেয়া দ্রুততর এবং শিক্ষক যা বলেছেন তার কাছাকাছি হয়। তবে এ যুগে শিশুদের হাতে লেখা শেখানো বাদ দেয়ার সময় হয়েছে কিনা তা নিয়ে এখনো শিক্ষাবিদদের মধ্যে কোনো আন্তর্জাতিক ঐক্যমত হয়নি।

এখন হাতের লেখার চল উঠে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি কাদের? যারা হাতে লেখালেখির সরঞ্জাম তৈরি করে বা বিক্রি করে! আর কাদের? আমেরিকার লেখালেখির সরঞ্জাম তৈরি করে এমন লোকদের নিয়ে গঠিত সংগঠন ‘রাইটিং ইস্ট্রুমেন্ট ম্যানুফেকচারিং এসোসিয়েশন’ ডাবলিউআইএমএ ভেবে দেখলো এভাবে হবে না। ওরা একটা দিন ঠিক করল যেদিন সবাই হাতের লেখা নিয়ে ভাববে হাতের লেখার গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা করবে এবং হাতে লেখালেখিও করবে। দিনটি ঠিক করা হলো ২৩ জানুয়ারি। সেদিন আবার জন হ্যানককের জন্মদিন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুক্তির সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন। এই স্বাক্ষরের ফলে আমেরিকায় বৃটিশদের উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়। এটিকে আমেরিকার মুক্তিযুদ্ধও বলা যেতে পারে। এই যুদ্ধ ১৭৭৫ সালে হওয়ার যুদ্ধ শুরু হয় এবং প্রায় ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত চলে। জন হ্যানককের দীর্ঘ এবং সুন্দর স্বাক্ষরের জন্য এই দেশপ্রেমিক একটা নতুন পরিচয় পান। এ কথাটি মনে রেখে ডাবলিউআইএমএ -র কর্তা ব্যক্তিরা